Home / জাতীয় / ১৪২৭ বাঙালির জীবনে অন্যরকম বর্ষবরণ

১৪২৭ বাঙালির জীবনে অন্যরকম বর্ষবরণ

বাঙালি জাতিকে, এ জাতির চার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার অনন্য এক উপলক্ষ বাংলা নববর্ষ বরণ উৎসব। সময় প্রবাহে বেড়েছে এ উৎসবের ব্যাপ্তি, পেয়েছে সর্বজনীনতা, আদায় করে নিয়েছে বিশ্বের অন্য সব জাতির সমীহ।১৪২৭ বর্ষবরণ

পৃথিবীর সব জাতির সম্মিলিত সংগঠন জাতিসংঘ। এ সংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার করা বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় রীতিমতো স্থান করে নিয়েছে পহেলা বৈশাখের সকালে ঢাকা বিশ্ববাদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ উপলক্ষে একমাস আগে থেকেই চলে সাজ সাজ রব।

অথচ এবার বাঙালির সার্বিক অর্থেই সর্ববৃহৎ এ উৎসবের আকাশ ঢেকে দিয়েছে আতঙ্ক, উদ্বেগের কালো মেঘ। সামাজিক সম্মিলনের পরিবর্তে জাতি এখন সচেতনভাবেই রক্ষা করছে সামাজিক দূরত্ব। আজ নেই কোনো শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে নেই ছায়ানটের পরিবেশনা, পার্ক কিংবা টিএসসিতে হবে না প্রাণের মিলন। দেখা মিলবে না ললনাদের পরনে সাদা শাড়ির লাল পার। ঘরে ঘরে পান্তা ইলিশের আয়োজনও কম থাকবে। এমন বৈশাখ এর আগে কোনোদিন দেখেনি বাঙালি।

তবু একটি বিষয় পরিষ্কার যে, সামাজিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও হার্দিক কার্পণ্য নেই। কারণ এটি আমাদের জাতিগত সত্তার গভীরে প্রোথিত। তাই অকৃত্রিম ভালোবাসায় শুভ কামনা জানাই আজ শুরু হওয়া বাংলা নববর্ষকে। স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৭।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বৈশাখে এবার সবাইকে ঘরবন্দি করে দিয়েছে অজানা, ছুতে না পাওয়া এক ভাইরাস। করোনায় আতঙ্কিত মানুষ বেঁচে আছে, তবে আনন্দে নেই। নেই উৎসবের আলোকচ্ছটা, সবকিছু যেন বিবর্ণ।

বৈশাখ আমাদের কাছে আসে নতুন আশা, স্বপ্ন ও প্রত্যয় নিয়ে। সব অশুভ ও অসুন্দরকে দূরে ঠেলে বৈশাখ আসে নতুনের কেতন উড়িয়ে। নতুন বছরে মানুষ করোনার মহামারী থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যয় পালন করবে। বৈশাখের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীনতা। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জীর উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু বাংলা নববর্ষ একান্তই সাংস্কৃতিক ও বৈশ্বিক। এটি ধর্মীয় বলয় থেকে উৎসারিত নয়। পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহর শুরু হয় যে বর্ণিলতার মধ্য দিয়ে, এবার তা দেখা যাবে না।

ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘বর্তমান মহামারীতে বিশ্বজুড়ে অগণ্য মানুষের জীবনাবসান ও জীবনশঙ্কার ক্রান্তিলগ্নে ছায়ানট এবার ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’এ অঙ্গীকার নিয়ে সীমিত আকারে অনুষ্ঠান উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।’ বাংলাদেশ টেলিভিশন (১৪ এপ্রিল) সকাল ৭টায় অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করবে। বিটিভি ছাড়াও অনলাইনে ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেল থেকে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন বাংলা নববর্ষেও সব অনুষ্ঠানে জনসমাগম বন্ধ রাখার। ঘরে বসে ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে’ পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য বলেছেন তিনি। তাই আমরা আশা করি, মানুষ ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করবেÑ শুধু নিজেদের মনকে প্রশান্ত রাখার জন্য।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, বৈশাখে বাঙালির প্রাণগুলো এক হয়। আমরা বিগত প্রতিবছর আমাদের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলোকে দূরে সরিয়ে নতুন বছর শুরু করি। পুরনো বছরের হালখাতা বন্ধ করে নতুন বছরের খাতা খুলি। কিন্তু এবার বৈশাখের আগে যে খাতা আমরা খুলেছি, তার শেষ কোথায় হবে তার উত্তর জানা নেই কারও।

প্রতিবছর বৈশাখের কয়েক মাস আগে থেকে মার্কেটগুলো সেজে ওঠে লাল-সাদা রঙে। এবারও তা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যা হওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই হয়নি। করোনার কালো থাবা রঙিন বৈশাখকে আজ ধূসর করে দিয়েছে। এ বিষয়ে কথা হয় আজিজ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সারোয়ার হোসেন জানান, আজিজে শেষ দশ বছর ধরে দোকান চালাই। এক বৈশাখকে ঘিরেই আয়োজন করি সারা বছর ধরে। আর কোনো দিন আয়োজন করতে পারব কিনা। বৈশাখকে ঘিরে বিক্রির চিন্তা তো মাথায় আসা তো দূরের কথা, এখন শুধু বাঁচার চিন্তা। জানি না সামনের বৈশাখ পর্যন্ত বাঁচতে পারব কিনা। বাঙালিরা আর কোনো বৈশাখ পালন করতে পারবে কিনা।

সারোয়ার হোসেনের মতো এমন নিরাশার বাণী সারাবিশ্বের মানুষের। করোনা ভাইরাস গ্রাস করছে ২১০টির বেশি দেশকে। যার থাবায়প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের মতো মানুষ। আক্রান্ত হয়ে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। আর নিজেদের বাঁচাতে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। যার ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশ।

নভেম্বরে যখন করোনার প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটল চীনে, তখনো বাঙালির মনে কোনো শঙ্কা ছিল না এই ভয়ানক ভাইরাসটি ১ হাজার ১৮৯ মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করে বাংলাদেশে চলে আসবে। মানুষ যা ভাবেনি, তাই হয়েছে। নভেম্বরে জন্ম নেওয়া ভাইরাসটির প্রভাব বাংলাদেশে প্রথম ধরা পরে ৮ মার্চ। এর পর থেকে মানুষ তাদের জীবনে ভয়ে জীবন ও জীবিকার সব কাজ রেখে ঘরের মধ্যে আটকে রেখেছে শুধু একটু বাঁচার আশায়।

এ বিষয়ে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজকদের সঙ্গে কথা হয় বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। তারা জানান, প্রতিবছর বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাকে আমারা মঙ্গল শোভাযাত্রায় তুলে ধরার চেষ্টা করি। যাতে করে নতুন বছরে এসে এই সমস্যাগুলো আর আমাদের ঘিরে ধরতে না পারে। কিন্তু আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুরু হওয়া সমস্যার সমাধান চেয়ে বা প্রতীকী কিছু নিয়ে আজ আমরা রাস্তায় বের হতে পারছি না। একদিকে এই বিষয়টি যেমন কষ্ট দিচ্ছে, অন্যদিকে ভরসা দিচ্ছে। আমাদের এই সচেতনতাই পারবে এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে।

বৈশাখ মানেই কালবৈশাখীর ভয়। এবার বৈশাখ আসার এক সপ্তাহ আগে ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি শহরে বৈশাখী বাতাস বয়ে গিয়েছে। কিন্তু বৈশাখী বাতাসের সাথে উড়ে যায়নি আমাদের করোনা ভয়। দিন দিন এই ভয় আরও গেঁথে বসছে আমাদের মনে। তবু আমরা বাঁচার আশা করি রবিঠাকুরের প্রার্থনাকে সম্বল করে-

‘উড়ে হোক ক্ষয়/ধূলিসম তৃণসম পুরাতন বৎসরের যত/নিষ্ফল সঞ্চয়।’

About admin

Check Also

Prime Minister Sheikh Hasina

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে : প্রধানমন্ত্রী

  করোনার প্রকোপ অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *