Home / স্বাস্হ্য ও চিকিৎসা / ডেঙ্গুতে বাড়ছে মৃত্যু আতঙ্ক

ডেঙ্গুতে বাড়ছে মৃত্যু আতঙ্ক

দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করেছে। আক্রান্ত রোগীদের শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলোও চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ‘অনেক হাসপাতালে বেড খালি নাই’ সাইনবোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। Dengu Fever

সারা দেশে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি! এখন আক্রান্তের চেয়ে মৃত্যু নিয়ে মানুষ বেশি আতঙ্কিত! প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও বেসরকারিভাবে অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু দাবি করা হচ্ছে।

গতকালও ফরিদপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শারমীন (২২) নামে এক তরুণী, কক্সবাজারের টেকনাফে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবদুল মালেক (৩৫) নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়।

এছাড়াও ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফারুক খান (২২) নামে মাদারীপুরের এক যুবক এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ডেঙ্গুতে হামজা (১২) নামে আর এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই দিনে এতগুলো প্রাণ ঝড়ে যাওয়ায় সবার মাঝে বাড়ছে মৃত্যু আতঙ্ক।

এদিকে আগস্ট মাসের শুরুতেই প্রায় এক হাজার ৭৫০ জন আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।আক্রান্তদের বেশিরভাগই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার আক্রান্তদের শুধু ১২টি সরকারি ও ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যা মোট হাসপাতালের ৭ ভাগেরও কম।

গত মাসে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৬১৪ জন। এর আগে জুনে এক হাজার ৮৬৩ এবং মে মাসে মাত্র ১৯৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির তথ্য রয়েছে। জুলাই মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, আগস্ট মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আগস্ট মাসে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়। তখন আমাদের আশপাশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই আগস্ট হলো ডেঙ্গুর প্রকোপের মাস। ধারণা করা হচ্ছে, শক্তভাবে এ মাসে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে না পারলে চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত জুলাইয়ের দ্বিগুণ হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ভারতের কোলকাতায় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সফল বিশেষজ্ঞ অনীক ঘোষকে দেশে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি তাকে বলেছি, তোমাদের যা যা অভিজ্ঞতা আছে তা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করো। তিনি খুব শিগগির আসবেন।

আমার সততার কমতি নেই, কিন্তু অভিজ্ঞতার কমতি আছে। পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে জটিল হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা সমন্বিতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৪, ১৮, ২২, ২৩, ২৬, ৩৫, ৪২, ৫৩, ৫৫, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড এখন ডেঙ্গু মুক্ত। তবে ৬৬টি ভবনে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এখন তারা ৫৭টি ওয়ার্ডে ৬৮টি টিমের মাধ্যমে ৪৫০ জায়গায় ডেঙ্গু বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। গতকাল ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক শেষে তারা এ কথা বলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত বুধবার বিকাল থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত সারা দেশে এক হাজার ৭১২ জন আক্রান্ত হয়েছে। আর এর আগে ৩১ জুলাই আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫৬২ জন।

ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আর কমছে না। রাজধানীর অতিরিক্ত রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো। তাই গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ১৫০ শয্যার ডেঙ্গু সেলকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত ১০ লক্ষাধিক টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন ১০০ বেডের একটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে শতাধিক নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে নিজের সমালোচনা এড়াতে পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এদিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা আরও সহজ করতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স ও জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য বিনামূল্যে রক্ত থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহ করে দেবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, এতে রোগীর অন্তত ১৩ হাজার টাকা খরচ বেচে যাবে।

এদিকে বিদেশ থেকে কার্যকর ওষুধ আনতে গড়িমসির বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে আদালত গতকাল তলব করলে তিনি বলেন, মশার উপদ্রব যখন শুরু হয় তখন দুই সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করি।

কিন্তু ওষুধ ঠিক মতো কাজ করছে না চায়না থেকে ওষুধ আনার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা তদারকি-মনিটরিং সবকিছু করছি। ওষুধ আনতে লাইসেন্স লাগবে। উত্তর সিটি কর্পোরেশন নমুনা সংগ্রহ করেছে। যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ আনার ব্যবস্থা করা হবে, ওষুধ আনার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা সমন্বয় করে ওষুধ আনব।

অপরদিকে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেঙ্গু আক্রান্ত সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু ও অসচ্ছলদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে সরকারি হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ মোতাবেক কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালককে প্রতিবেদন আকারে আদালতে জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ২০ আগস্টের মধ্যে আদালতকে জানাতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, গত বুধবার বিকাল থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৭১২ জন। এদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি আছে এক হাজার ৫০ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে ২২২ জন।

মিটফোর্ড হাসপাতালে রয়েছে ৮১ জন। সরকারি শিশু হাসপাতালে ২৫ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৬ জন। হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৫ জন। বারডেম হাসপাতালে রয়েছে ৩২ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ৩০ জন।

রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ৩৯ জন। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৬ জন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫৫ জন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪৩ জন। এছাড়াও বিভিন্ন বেসকারি হাসপাতালে ৩৮৮ জন ভর্তি আছে এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি আছে আরও ৫৬২ জন।

চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৫১৩ জন। জুলাইতে ১০ জন, জুনে দুইজন এবং এপ্রিলে দুইজনসহ মোট ১৪ জন মারা গেছে। যার মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালেই ১৩ জন মারা গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে রয়েছে ৫ হাজার ৮৩৮ জন।

চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৩ হাজার ৬৬১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে শুধু ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৪৯ জন। হাসপাতালে আছে ৪ হাজার ৩৩২ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ১১ হাজার ৭০৩ জন। শুধু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৭ হাজার ২৬৯ জন। এদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে আছে এক হাজার ৬২৪ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ৫ হাজার ৬৩২ জন।

ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পেতে এখনই

শালিখা নিউজ এর ফেসবুক পেইজে facebook.com/newsshalikha24 লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন।

About admin

Check Also

Corona Eye

আপনার চোখই বলে দেবে আপনি করোনায় আক্রান্ত কি না?

চোখ আমার-আপনার ভেতরের আয়না। মুখে না-বলা অনেক কথা চোখ বলে দেয়। চোখ দেখে রোগ ধরা, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *